
রুশদানকে নিয়ে যখন বাইরে বা সুপারশপে যাই, তখন ওর চোখগুলো যেন চকচক করতে থাকে! আর করবেই বা না কেন? মুদি দোকান বা সুপারশপের তাকগুলো সাজানো থাকে একদম নজরকাড়া সব জিনিস দিয়ে। লাল, নীল, সবুজ রঙের চিপস, ক্যান্ডি, জেলি, আর লোভনীয় প্যাকেটের জুস—দেখলে তো আমার নিজেরই খেতে ইচ্ছে করে, আর ও তো বাচ্চা!
বাচ্চাদের আবদার মেটাতে বা কান্না থামাতে মায়েরা খুব সহজেই পকেট থেকে একটা রঙিন ক্যান্ডি বা প্যাকেট জুস বের করে দেন। “একটু তো মিষ্টি, খেলে কী আর এমন হবে!”—এই ভেবে আমরা নিশ্চিন্ত থাকি।
কিন্তু, এই রঙিন এবং সুন্দর দেখতে খাবারগুলো আপনার বাচ্চার ব্রেনের সাথে কত বড় একটা ধোঁকাবাজি করছে জানেন?
কৃত্রিম রঙ আসলে কী?
বাজারের ক্যান্ডি, প্যাকেটজাত জুস, রঙিন বিস্কুট, আইসক্রিম — এই সবকিছুতে যে চোখ ধাঁধানো রঙ থাকে, তার বেশিরভাগই আসে কৃত্রিম রাসায়নিক রঙ থেকে। যেমন Red 40, Yellow 5, Blue 1 — এই নামগুলো প্যাকেটের গায়ে ছোট করে লেখা থাকে, আমরা খেয়াল করি না।
এই রঙগুলো খাবারকে আকর্ষণীয় করে তোলে ঠিকই, কিন্তু শরীরে এগুলোর কোনো পুষ্টিগুণ নেই। শুধু চোখ ভোলানোর জন্য মেশানো হয়।
সাউদাম্পটন বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণায় দেখা গেছে, কৃত্রিম রঙ খাওয়া বাচ্চাদের মধ্যে হাইপারঅ্যাকটিভিটি বা অতিরিক্ত চঞ্চলতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। এই গবেষণার ফলাফল এতটাই শক্তিশালী ছিল যে যুক্তরাজ্যে এখন অনেক খাবারে এই রঙ ব্যবহারের ক্ষেত্রে সতর্কতা লেবেল বাধ্যতামূলক।
কীভাবে এটা মস্তিষ্কে প্রভাব ফেলে? কৃত্রিম রঙ মস্তিষ্কের স্নায়ুতন্ত্রকে উত্তেজিত করে তোলে। যে অংশ মনোযোগ আর আবেগ নিয়ন্ত্রণ করে, সেই অংশের কাজে ব্যাঘাত ঘটায়। ফলে বাচ্চা হঠাৎ অস্থির হয়ে যায়, রাগ বেড়ে যায়, ঘুমেও সমস্যা হয়।
আমেরিকান একাডেমি অব পেডিয়াট্রিক্সও সতর্ক করেছে যে কিছু বাচ্চার ক্ষেত্রে কৃত্রিম রঙ ADHD-এর মতো লক্ষণ আরো তীব্র করে তুলতে পারে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সমস্যাটা কোথায়?
আমাদের দেশের বাজারে বেশিরভাগ রঙিন লজেন্স, চিপস, প্যাকেটজাত জুস আর আইসক্রিমে এই কৃত্রিম রঙ অবাধে ব্যবহার হয়। প্যাকেটের গায়ে লেখা থাকলেও বেশিরভাগ মা বাবা সেটা পড়ে দেখেন না। আর বাচ্চাদের কাছে এই জিনিসগুলো এতটাই সহজলভ্য যে প্রতিদিনের অভ্যাসে পরিণত হয়ে যায়।
রাস্তার পাশের দোকান, স্কুলের সামনের ভ্যান — সবখানেই এই রঙিন প্রলোভন। আর বাচ্চারা রঙ দেখেই আকৃষ্ট হয়, স্বাদ পরে বোঝে।
তাহলে কী করব?
সম্পূর্ণ বন্ধ করা কঠিন, কিন্তু সচেতন থাকা যায়।
প্যাকেটের গায়ে উপকরণের তালিকা একবার দেখার অভ্যাস করুন। “Artificial Color” বা রঙের নম্বর লেখা থাকলে বুঝে নিন এটা দেয়া যাবে না।
মা হিসেবে আমি জানি, বাচ্চার জেদ সামলানো কতটা কঠিন। কিন্তু যে খাবার ওর ব্রেনকে অলস আর অস্থির করে দেয়, সেটা তো আর আসল আদর হতে পারে না, তাই না?
আমি এখন রুশদান জেদ করলে ওকে রঙিন ফলের বাটি দিই, অথবা আমার বানানো খেজুর চিনি দিয়ে কেক, পেস্ট্রি বানিয়ে দিই। বিশ্বাস করুন, কয়েকদিন এই প্যাকেটজাত খাবার থেকে দূরে রাখলেই দেখবেন, আপনার বাচ্চার মেজাজ আগের চেয়ে অনেক শান্ত হয়ে গেছে।
রুশদানের জন্য যা বানাই, ঠিক সেটাই আপনার বাবুর জন্য — ঘরে বানানো, নো প্রিজারভেটিভ, সাদা চিনি ছাড়া।
আরও গল্প পড়ুন

আগে হাঁটতে শেখা মানেই কি বাচ্চা বেশি বুদ্ধিমান?
"আমার ছেলে তো হামাগুড়ি না দিয়েই হাঁটা শুরু করেছে! ৭ মাসেই দেয়াল ধরে দাঁড়াতো, আর ১০ মাসেই সোজা হাঁটা শুরু করেছে!"
পুরো গল্পটা পড়ুন →
“আমি মা, যা বলব তাই হবে!” — কার্টুন আর এক শুক্রবার
গত শুক্রবার বিকেলে রুশদান টিভিতে কার্টুন দেখছিল। আধা ঘণ্টা পার হয়ে গেছে, চোখ প্রায় স্ক্রিনের সাথে লেগে আছে। আমি গিয়ে বললাম, "টিভি বন্ধ করো।"
পুরো গল্পটা পড়ুন →
৩ কোটি শব্দের ব্যবধান: বাচ্চার সাথে কথা বলার জাদু
১৯৯৫ সালে আমেরিকার দুজন গবেষক Betty Hart এবং Todd Risley একটা যুগান্তকারী গবেষণা করেন। তারা তিন বছর ধরে বিভিন্ন পরিবারের বাচ্চাদের পর্যবেক্ষণ করেন এবং দেখেন — যে বাচ্চারা জীবনের প্রথম…
পুরো গল্পটা পড়ুন →