
কদিন আগের ঘটনা। আমার এক বান্ধবী এসেছিল ওর তিন বছরের ছেলেকে নিয়ে।
বাচ্চাটা ড্রয়িংরুমে বসে একটা পাজল মেলাচ্ছিল। আমি খেয়াল করলাম, ঠিক ৫ মিনিট পরই সে পাজলটা ছুড়ে ফেলে দিল! এরপর গেল টিভির রিমোটের দিকে, সেটা ২ মিনিট চেপে আবার দৌড় দিল ব্যালকনিতে।
ওর মা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আমাকে বলল, “দেখলি? ওর কোনো কিছুতে ধৈর্য নেই। একটা জায়গায় ৫ মিনিট স্থির হয়ে বসে না, মনোযোগ তো জিরো!”
আমি একটু হেসে জিজ্ঞেস করলাম, “সকালে নাস্তায় কী দিয়েছিলে?”
“শুধু পাউরুটি আর তালমিছরি দেওয়া দুধ।” এরপর ও নিজেই যোগ করল, “খাওয়ার আধা ঘণ্টার মধ্যে ওর অবস্থা দেখার মতো হয়েছিল— দৌড়াদৌড়ি, লাফালাফি, একটানা চিৎকার! আমি ভাবলাম বাহ, আজ তো বেশ ফুরফুরে মেজাজে আছে।
কিন্তু ঘণ্টাখানেক পর সেই একই বাচ্চা একদম নেতিয়ে পড়ল। শুধু কান্নাকাটি, খিটখিটে মেজাজ, আর কোনো খেলাতেই মন বসছে না।”
আমার কাছে বিষয়টা একদম পরিষ্কার হয়ে গেল। বাচ্চার এই যে এনার্জির ওঠানামা, এর আসল কারণ ওর স্বভাব নয়, ওর সকালের নাস্তা!
আমাদের মস্তিষ্ক শরীরের সবচেয়ে বেশি এনার্জি খরচ করা অঙ্গ। আর এই এনার্জির প্রধান উৎস গ্লুকোজ — যেটা আমরা খাবার থেকে পাই।
কিন্তু সব গ্লুকোজ একইভাবে কাজ করে না।
এখন আমরা যখন বাচ্চাকে সাদা পাউরুটি, চিনি বা তালমিছরি দেওয়া দুধ, বিস্কুট বা প্যাকেটজাত জুস খেতে দিই, তখন শরীরের ভেতরে একটা ছোট্ট দুর্ঘটনা ঘটে যায়।
এই খাবারগুলোকে বলে ‘সিম্পল কার্বোহাইড্রেট’। এগুলো পেটে যাওয়ার সাথে সাথেই হজম হয়ে যায় এবং রক্তে একগাদা গ্লুকোজ ঢেলে দেয়। ব্রেন হঠাৎ এত গ্লুকোজ পেয়ে ওভারলোডেড বা ‘হাইপার’ হয়ে যায়। ফলে বাচ্চা তখন অতিরিক্ত চঞ্চল হয়ে ওঠে।
কিন্তু ঠিক আধা ঘণ্টা বা ১ ঘণ্টা পরেই সেই গ্লুকোজ ফুরিয়ে যায়! তখন বাচ্চার ব্রেন হঠাৎ করেই সিগন্যাল পায়— “এনার্জি নেই!” আর ঠিক তখনই সে ক্লান্ত হয়ে পড়ে, মেজাজ খিটখিটে হয় এবং কোনো কিছুতেই আর মনোযোগ ধরে রাখতে পারে না।
এখন উপায় হলো ব্রেনকে এমন খাবার দেয়া, যা ধাপে ধাপে, অল্প অল্প করে সারাদিন ধরে ব্রেনকে গ্লুকোজ সাপ্লাই দেবে। এটাকে বলে ‘কমপ্লেক্স কার্বোহাইড্রেট’ বা ‘স্লো রিলিজ এনার্জি’ (Slow Release Energy)।
এই কাজের জন্য ওটস, লাল চাল আর কিনোয়া খিচুড়ি (Quinoa) হলো একদম সুপারহিরো! এগুলোতে প্রচুর পরিমাণে ফাইবার থাকে বলে হজম হতে সময় নেয়। ব্রেন একসাথে অনেক গ্লুকোজ না পেয়ে, সারাদিন ধরে একটু একটু করে এনার্জি পেতে থাকে।
এর ফলে বাচ্চার ব্রেন সারাদিন শান্ত থাকে। সে যখন একটা কাজ করে বা নতুন কিছু শেখে, তখন সেটায় ফোকাস করতে পারে। ওর এনার্জি লেভেল হুট করে বাড়ে-কমে না বলে ওর মেজাজও ফুরফুরে থাকে।
রুশদানের খাবারে আমি এখন এই জিনিসটা মাথায় রাখি
সকালে ওটস দিই, ফলের সাথে মিশিয়ে বা লাল আটার রুটির সাথে ডিম, সবজি। দুপুরে অনেক সময় কিনোয়া খিচুড়ি রান্না করি একদম ঘরোয়া স্বাদে। এতে প্রোটিন আর কমপ্লেক্স কার্ব একসাথে পাওয়া যায়, যেটা মস্তিষ্কের জন্য একদম আদর্শ কম্বিনেশন।
এই জন্যই কিনোয়া খিচুড়ি বানানোর সময় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলাম এই একটা জিনিসে — বাচ্চার মস্তিষ্ক যেন সারাদিন স্থির এনার্জি পায়, হুট করে উত্তেজিত হয়ে আবার হুট করে নেতিয়ে না পড়ে।
খাবার শুধু পেট ভরানোর জন্য না, সারাদিনের মেজাজ আর মনোযোগ ঠিক রাখারও প্রথম ধাপ।
রুশদানের জন্য যা বানাই, ঠিক সেটাই আপনার বাবুর জন্য — ঘরে বানানো, নো প্রিজারভেটিভ, সাদা চিনি ছাড়া।
আরও গল্প পড়ুন

বাচ্চার প্লেট খালি করার জেদই আপনার সবচেয়ে বড় ভুল!
"আর দুইটা লোকমা খাও, তাহলেই প্লেট খালি!" "সবজিটা শেষ করো, তারপর চকলেট দেব।"
পুরো গল্পটা পড়ুন →
ভয় দেখিয়ে খাওয়ানো: শর্টকাটের আড়ালে বড় ক্ষতি
"ভাত না খেলে কিন্তু পুলিশ ডাকবো!" অথবা, "চোখ বন্ধ করো, নাহলে কিন্তু ভূত এসে ধরে নিয়ে যাবে!" আমাদের দেশে এই ডায়লগগুলো শোনেননি, এমন মানুষ মনে হয় খুঁজে পাওয়া যাবে না। ছোটবেলায় আমরা…
পুরো গল্পটা পড়ুন →
বাচ্চার বেয়াদবি বা অদ্ভুত আচরণ সামলাবেন কীভাবে?
রুশদান নানা বাড়িতে বেড়াতে এসেছে কদিন হলো। রুশদান ওর নানাবাড়িতে এলে এমনিতেই একটু বেশি এক্সাইটেড থাকে, আর ওর মামাকে তো চোখের আড়াল করতেই চায় না।
পুরো গল্পটা পড়ুন →