
রুশদানের প্রথম কয়েকটা মাস আমার জন্য ছিল এক দুঃস্বপ্নের মতো। ওর ঘুমের কোনো নির্দিষ্ট রুটিন ছিল না। দিনের বেলা কুম্ভকর্ণের মতো ঘুমাতো, আর রাত হলেই ওর চোখ ড্যাবড্যাব করে জ্বলে উঠতো! আমি ভাবতাম, “ছেলেটা কি পেঁচার জাত?”
তখন জানতাম না যে, নবজাতক বা ০-৩ মাসের বাচ্চাদের ব্রেনে আসলে ‘দিন’ আর ‘রাত’ বোঝার মতো কোনো ঘড়ি (Circadian Rhythm) তৈরি হয় না। ওদের ছোট পেট খুব দ্রুত খালি হয়ে যায় বলে ওরা বারবার জাগে আর ঘুমায়। এই সময়ে ২৪ ঘণ্টায় ১৪-১৭ ঘণ্টা ঘুম ওদের দরকার হয়, কিন্তু রুটিন আশা করা বোকামি।
আসল পরিবর্তনটা আসা শুরু করে ৪-৫ মাস বয়স থেকে। এই সময় থেকে বাচ্চার ব্রেন দিন আর রাতের পার্থক্য বুঝতে পারে। তখনই একটা রুটিন তৈরি করার সময় হয়। এই ৪-১১ মাস বয়সে বাচ্চাদের ১২-১৫ ঘণ্টা ঘুম দরকার হয়। রাতে টানা ঘুমের পাশাপাশি দিনে ২-৩ বার ন্যাপ বা ছোট ঘুম লাগে।
কিন্তু রুটিনটা পুরোপুরি ঠিক হয় সাধারণত ১ থেকে ২ বছর বয়সে এসে। এই বয়সে বাচ্চাদের ১১-১৪ ঘণ্টা ঘুম দরকার। সাধারণত দুপুরে একবার ২-৩ ঘণ্টার একটা ঘুম আর রাতে টানা ঘুম—এটাই হলো আদর্শ রুটিন। ৩-৫ বছর বয়সে এসে এই চাহিদা ১০-১৩ ঘণ্টায় দাঁড়ায় এবং অনেকেই তখন দুপুরের ঘুমটা ছেড়ে দেয়। রুশদানের এখন এই বয়সটা চলছে।
সঠিক সময়ে না ঘুমালে কী ক্ষতি হয়?
একটা সময় রুশদান রাত ১১টা-১২টা বেজে গেলেও ঘুমাতে চাইতো না। আমি ভাবতাম, “ঘুমাচ্ছে না যখন, জোর করে কী লাভ! সকালে তো দেরিতেই উঠছে, ঘুমের হিসাব তো সমান হয়েই গেল।”
কিন্তু কিছুদিন পর খেয়াল করলাম, সকালে ওঠার পর থেকে ওর মেজাজ চরম খিটখিটে থাকে, অকারণে জেদ করে আর খাওয়া নিয়ে কান্নাকাটি করে।
বাচ্চার গভীর ঘুমের সময় (বিশেষ করে রাত ১০টা থেকে ২টার মধ্যে) শরীর থেকে ‘গ্রোথ হরমোন’ রিলিজ হয়, যা বাচ্চাকে লম্বা হতে ও বড় হতে সাহায্য করে। বাচ্চা দেরিতে ঘুমালে এই ম্যাজিক সময়টা মিস করে ফেলে, ফলে তার শারীরিক বৃদ্ধি আটকে যায়। শুধু তাই নয়, ঘুমের অভাবে বাচ্চার ব্রেনের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়, ইমিউনিটি কমে গিয়ে দ্রুত অসুস্থ হয় এবং সারাদিন সে চরম জেদি আচরণ করে।
কীভাবে রুটিন ঠিক করবেন? (আমার অভিজ্ঞতা)
একদিনেই তো আর অভ্যাস বদলাবে না! আমি রুশদানের জন্য এখন একটা কড়া ‘বেডটাইম রুটিন’ সেট করেছি:
১. রাত ৯টা বাজলেই ঘরের সব টিভি-মোবাইল বন্ধ। স্ক্রিনের ব্লু-লাইট ঘুমের হরমোন (মেলাটোনিন) নষ্ট করে দেয়।
২. ঘরের মূল লাইট বন্ধ করে ডিম লাইট জ্বালিয়ে দিই। কোনো হইচই বা জোরে কথা বলা বন্ধ।
৩. দুপুরে খুব দেরিতে (যেমন বিকেল ৪টা-৫টায়) ওকে ঘুমাতে দিই না। তাহলে রাতে আর ঘুম আসবে না।
৪. ওকে নিয়ে আমি শুয়ে পড়ি। আমি যদি মোবাইল চাপি বা গল্প করি, ও কখনোই ঘুমাবে না। তাই ওর সাথে সাথে আমাকেও চোখ বন্ধ করে ঘুমানোর নিখুঁত অভিনয় করতে হয়!
ঘুম আসলে বাচ্চার ব্রেন আর শরীরের চার্জার। এই চার্জিং ঠিকমতো না হলে পরের দিন বাচ্চা হ্যাং হওয়া মোবাইলের মতোই আচরণ করবে।
রুশদানের জন্য যা বানাই, ঠিক সেটাই আপনার বাবুর জন্য — ঘরে বানানো, নো প্রিজারভেটিভ, সাদা চিনি ছাড়া।
আরও গল্প পড়ুন

দেরিতে কথা বলা নিয়ে মায়ের দুশ্চিন্তা
মায়েরা মনে হয় পৃথিবীর সবচেয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত প্রাণী! মাথার ভেতর সারাক্ষণ একটা অদৃশ্য 'চেকলিস্ট' ঘুরতে থাকে— বাচ্চা ৬ মাসে বসল কি না, ১ বছরে হাঁটল কি না, আর ২ বছরে গড়গড় করে কথা বলল কি…
পুরো গল্পটা পড়ুন →
বাচ্চার উচ্চতা বাড়াতে মা-বাবার করণীয়
গতকাল আমি বাচ্চার খাটো হওয়ার পেছনে দীর্ঘমেয়াদি অপুষ্টি, রোদ না লাগানো আর কোষ্ঠকাঠিন্যের মতো কারণগুলো নিয়ে কথা বলেছিলাম। অনেকেই জানতে চেয়েছেন, "আপু, তাহলে এখন আমাদের করণীয় কী? কীভাবে…
পুরো গল্পটা পড়ুন →
মা হওয়ার পর মস্তিষ্কের অদ্ভুত রহস্য
পৃথিবীর কিছু ব্যাপার বড় অদ্ভুত। যেমন ধরুন, মায়েদের মস্তিষ্ক। মাঝে মাঝে আমার নিজেকে খুব অচেনা লাগে। মনে হয়, এই আমিটাকে তো আমি চিনি না। এই তো সেদিনকার ঘটনা। চুলোয় দুধ বসিয়ে দিয়ে রুশদানের…
পুরো গল্পটা পড়ুন →